- Ajker songbad - http://ajkersongbad24.com -

চিলমারীর ৫ নারী জয়িতার জীবন গল্প

নুরবক্ত আলী,কুড়িগ্রাম  প্রতিনিধিঃ
কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার ৫জন সফল নারীকে জয়িতা হিসেবে গত ৯ ডিসেম্বর উপজেলা প্রশাসন ও উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার কার্যালয়ের পক্ষ থেকে জয়িতা অন্বেষণে বাংলাদেশ কার্যক্রমের আওতায় সংবর্ধিত করা হয়েছে। জীবন যুদ্ধে হার না মানা এসব নারী পৌঁছাতে চান স্বপ্নচুড়ায়।

মোছাঃ হালিমা বেগম
মোছাঃ হালিমা বেগমের জমিজমা অনেক ছিল। কিন্তু নদীগর্ভে বিলীন হওয়া সত্ত্বেও তার একক প্রচেষ্টায় ১০ ছেলে মেয়েকে সঠিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করেন। হালিমা বেগমের চার ছেলে ও ছয় মেয়ে যারা সকলেই স্বশিক্ষিত। তার ১ম সন্তান মোঃ রফিকুল ইসলাম (এমএ) বাণিজ্য মন্ত্রীর একান্ত সচিব। ২য় সন্তান মোঃ সফিউল আলম (বিএ) উচ্চ পর্যবেক্ষক, আবহাওয়া অধিদপ্তর, রংপুর, ৩য় সন্তান মোঃ সাইফুল আজম (বিএসএস) পেশাঃ লোকো মাষ্টার, বাংলাদেশ রেলওয়ে, তিনি কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস এর প্রথম রেল চালক হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন, ৪র্থ সন্তান মোঃ সাজেদুল ইসলাম (এমকম) হিসাব রক্ষক, আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস, ঠাকুরগাও, ৫ম ও ৬ষ্ঠ সন্তান মোছাঃ লায়লা সিদ্দিকা ও রহিমা খাতুন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক এবং বাকি সন্তানেরা সুশিক্ষিত হয়ে সংসার করছেন। এ বছর তাকে একজন সফল জননী হিসেবে সংবর্ধিত করা হয়।

মোছাঃ লালভানু বেগম
মোছাঃ লালভানু বেগম এর শিক্ষা জীবন শুরু হয় রমনা ছিন্নমুকুল নামক প্রতিষ্ঠানে। পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো না হওয়ায় বাল্য বিবাহ দিতে চাইছিল। কিন্তু তাতে সে রাজি ছিল না। বাবা রাজি করিয়ে পড়ালেখা চালিয়ে যায় সে। লালভানু বেগম যখন এইচএসসিতে পড়ে তখন তার বাবা হঠাৎ অসুস্থ্য হয় এবং মৃত বরন করে। পরিবারে নেমে আসে চরম বিপর্যয়। ৪ বোন ১ ভাই ও বিধবা মাকে নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করতে থাকে। এদিকে ব্রহ্মপুত্র নদীতে লালভানুদের বসত বাড়ী কয়েকবার ভাঙ্গার পর বাঁধের রাস্তায় আশ্রয় নেয়। বাল্যবিয়ের শিকার বড় বোনের সংসারেও অশান্তি। এ সময় অন্য ২ বোন ও ১ ভাই নিয়ে খুবই বিপদে পরে তারা। একমাত্র ভাই অন্যের কথায় বিয়ে করে শশুর বাড়ীতে চলে যায়। লালভানুর আগ্রহ তাকে দাবিয়ে রাখতে পারেনি। এইচএসসি পাশ করার পর পরেই জাতীয় পুষ্টি কার্যক্রমে চাকুরী হয় তার। এ থেকে সমাজের অবহেলিত ও নির্যাতিত জনগোষ্ঠির সেবা করা সুযোগ পায় সে। চাকুরীর পাশাপাশি লেখাপড়াও চালিয়ে যায় সে। বিএ পাশ করে এখন এম এ তে অধ্যায়নরত। লালভানু বেগম মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের ভিজিডি কার্যক্রমে সম্পৃক্ত থেকে এবং বর্তমানে আরডিআরএস- বাংলাদেশ এর প্রকল্প বিল্ডিং বেটার ফিউচার ফর গার্লস প্রকল্পে চাকুরী করে অবহেলিত নারীদের বাল্যবিবাহ, যৌতুক ও নারী নির্যাতন সংক্রান্ত বিষয়ে সচেতনার মাধ্যমে সমাজ উন্নয়নে অসামান্য অবদান রেখে চলেছে।

মোছাঃ মোসলেমা খাতুন
মোছাঃ মোসলেমা খাতুনের পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো না থাকায় কম বয়সে বিয়ে দিতে চেয়ে ছিলেন তার পরিবার। কিন্তু সে রাজি ছিল না। স্বপ্ন ছিল লেখাপড়া শেখার। ছিন্নমুকুল নামে একটি সংস্থা দুপুরের খাবারসহ লেখাপড়া শেখায়। এ কথা শুনে মা রাজি হলো ঐ স্কুলে ভর্তি করাতে কিন্তু বাবা রাজি ছিলেন না। যেখানে ভর্তি হয় সে। প্রথম থেকে ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত তার রোল ছিল এক। যখন ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে উঠে, তখন ঐ স্কুলে গিয়ে শোনে বিদ্যালয়ে দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে গেছে। তার শুধু মনে হত লেখাপড়ার হাল ছাড়ব না। এক সময় লেখাপড়া প্রায় বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল সেই সময় মেধাবী কল্যাণ সংস্থা মোসলেমার পাশে দাঁড়ায়। এই সংস্থার সহায়তায় এস,এস,সি পাশ করে। এইচ,এস,সি পাশের পর সে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে চায়। কিন্তু পরিবার থেকে কোন রকম সমর্থন পায় না সে। পড়ার খরচ না দিতে পারায় মোসলেমাকে বিয়ে দেয়াই ভালো হবে। সে গার্মেন্টেস এ কাজ করে হলেও বিশ্ববিদ্যালয় পড়বে শেষ পর্যন্ত অনেক প্রতিকূলতার মধ্যেদিয়ে ২০১৮-১৯ শিক্ষবর্ষে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পায় মোসলেমা। মেধাবী কল্যাণ সংস্থা এবং প্রশাসন ক্যাডারের বজলুর রশিদ ভর্তির ব্যবস্থা করে দেন। এখন সে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত। এ বছর তাকে “নির্যাতনের বিভীষিকা মুছে নতুন উদ্যোমে জীবন শুরু করেছেন যে নারীর” ক্যাটাগরীতে সংবর্ধিত করা হয়।

মোছাঃ মমতাজ বেগম
বীর মুক্তিযোদ্ধার বিধবা স্ত্রী মোছাঃ মমতাজ বেগম, ব্যাংকের অফিসার ক্যাশ পদে চাকুরীরত অবস্থায় তার স্বামীর মৃত হয়। জমজ মেয়েসহ ৪ সন্তানের জননী। স্বামীর মৃত্যুর সময় ছোট সন্তানের বয়স ছিল মাত্র ৬ মাস। বাড়িতে সেলাইয়ের কাজের পাশাপাশি কিন্ডার গার্টেন স্কুলে শিক্ষকতা করে ১ম মেয়ে কে কারমাইকেল কলেজ, রংপুর থেকে মাস্টার্স, ২য় মেয়েকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাষ্টার্স, ৩য় ছেলে কে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে অনার্স ও ছোট মেয়েকে জয়পুরহাট গালর্স ক্যাডেট কলেজ থেকে পাশ করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স পড়াচ্ছেন। মোছাঃ মমতাজ বেগম এর স্বামী একজন বীরমুক্তিযোদ্ধা হেতু বর্তমান সরকারের মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানীভাতা ও একটি কিন্ডার গার্ডেন স্কুল এর শিক্ষকতা ও পরিচালনায় নিযুক্ত থেকে যে আয় হয় তা দিয়ে বর্তমানে তার আর্থিক অবস্থা স্বচ্ছল, তিনি এখন আর কারো উপর নির্ভরশীল নন। এবছর তাকে “অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জনকারী নারীর” ক্যাটাগরীতে সংবর্ধিত করা হয়।

ধনেশ্বরী রাণী
দিনমজুর দরিদ্র হিন্দু পরিবারের ছয় ভাই বোনের একজন সন্তান হচ্ছেন ধনেশ্বরী রাণী। বোনদের মধ্যে দ্বিতীয়। প্রবল লেখাপড়ার আগ্রহ থাকার কারণে ২০০৬ সালে এসএসসি পাশ করার পর মা পরলোক গমন করে। দরিদ্র পরিবার তাই বাবা বড় বোনের বিয়ে দিয়ে দেন। এতে করে ধনেশ্বরীর প্রতি পরিবার সামলানোর দায়িত্ব বেড়ে যায়। কিন্তু লেখাপড়া থেমে থাকে নাই। দরিদ্র পরিবারের সন্তান হওয়ার কারণে তার জন্যও বাবা বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসে। বাবাকে বোঝায় বিয়ে করব না লেখাপড়া করব। পরবর্তিতে ২০০৮ সালে এইচএসসি পাশ করে অনার্সে ভর্তির কথা বাবাকে বললে বাবা আর পড়াতে পারবেনা বলে দেয়। তাই বাধ্য হয়ে ডিগ্রীতে ভর্তি হয়। পাশাপাশি টিউশনি করে নিজের পড়ার খরচ ও পরিবারে সামান্য সহযোগীতা করে। এর ফাঁকে ইসলামিক ফাউন্ডেশনে তথ্য সংগ্রহকারী হিসেবে একটি চাকুরী হয়। কিন্তু বিয়ে থেমে থাকে নাই। ডিগ্রী ২য় বর্ষে অধ্যায়নের সময় তার বিয়ে হয়। কিন্তু পড়াশুনার হাল ছাড়ে না সে। শত কষ্টের মাঝে স্বামীর সংসারে থেকে আমি ডিগ্রী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে ২য় বিভাগ নিয়ে পাশ করে। এরপর আরডিআরএস বাংলাদেশ এনজিও তে চাকুরী পায় সেখান থেকে বিভিন্ন এনজিওতে চাকুরীর পাশাপাশি ও স্বামীর ইচ্ছায় মাষ্টার্স রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয় নিয়ে অধ্যয়ন করে এবং প্রথম শ্রেণী অর্জন করে। বর্তমানে ধনেশ্বরী রাণী আরডিআরএস বাংলাদেশ বাস্তবায়িত বিল্ডিং বেটার ফিউচার ফর গার্লস প্রকল্পে চাকুরী করছে। বছর তাকে “শিক্ষা ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী নারী” হিসেবে সংবর্ধিত করা হয়। উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা সখিনা খাতুন বলেন, জয়িতা অন্বেষণে বাংলাদেশ কার্যক্রমের আওতায় এই ৫জনকে এবছর সংবর্ধিত করা হয়েছে।